রবিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৩, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন

প্রতিনিধি নিয়োগ-
ঢাকা সহ সারাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংবাদদাতা নিয়োগ করা হবে। আগ্রহী প্রার্থীরা dailyalochitosokal@gmail.com এ সিভি প্রেরণ করার জন্য অনুরোধ করছি।
শিরোনাম:
জীবনের যুদ্ধে হার না মানা সফল উদ্যোক্তা হারুন অর রশিদ

জীবনের যুদ্ধে হার না মানা সফল উদ্যোক্তা হারুন অর রশিদ

মোঃ রাশিদ নাইফ প্রিনন, স্টাফ রিপোর্টারঃ

২০০৬ সালে এমএ পাশ করার পর চাকুরীর বাজার দেখে হতাশ হয়ে পড়েছিল লালমনিরহাটের হারুন অর রশিদ। চোখে ছিল তাঁর স্বাবলম্বি হয়ে উঠার স্বপ্ন। কষ্টকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখী হয়ে জুটিয়েছিলেন একটি এনজিওর চাকুরী। সামান্য বেতনে ডিজিটাল এই সময়ের বিপক্ষে দাঁড়ানো কঠিন। তবে কি জীবনের যুদ্ধে হেরে যাবে হারুন ?

২০১০ সালে নিজের বিবেকের সাথে লড়াই করে অদম্য হারুন এনজিওর চাকুরী ছেড়ে দিয়ে লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার ছিটমহল বাঁশপচাই ভিতরকুটি নিজের গ্রামে চলে আসেন। ছিটমহলের বাসিন্দা হওয়ায় সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত ছিল তারা। অবসরপ্রাপ্তত শিক্ষক পিতা নুরুল ইসলামের সাথে পরামর্শ করে পিতা-পুত্র মিলে নিজের পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন। দশ বছরের মাথায় সেই মাছ চাষ হারুনের জীবনে সফলতা এনে দিয়েছে।

একজন প্রান্তিক চাষি হিসেবে ও অনগ্রসর এলাকায় মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরুপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় মৎস্য পদক হিসেবে স্বর্ণপদক ও নগদ ৫০হাজার টাকা প্রদান করেছে। গত ২৯ আগস্ট ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২১ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকে স্বীকৃতির স্বর্ণপদক ও চেক তুলে দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এমপি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এমপি।

তাই অনেকেই বলছেন, জীবনের যুদ্ধে হারেনি হারুন। বরং সে এখন বিজয়ী, সফল, সক্ষম এবং রংপুর বিভাগের একজন গর্বিত উদ্যোক্তা। হারুন, লামনিরহাটের জেলা প্রশাসক, জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় মৎস্য অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ঋনী বলে জানিয়েছেন। হারুন বলেন, লালমনিরহাট জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় মৎস্য অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ আমাকে সহায়তা না করলে হয়তো আমি এত্তো কম সময়ে সফল মৎস্য চাষী হতে পারতাম না।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, হারুন অর রশিদ মূল্যায়ন বছরে ৮.৫৫ মে.টন মলা ও রুই জাতীয় মাছ উৎপাদন করে অনগ্রসর এলাকায় মৎস্য উৎপাদনে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি ৭টি পুকুর নিয়ে মোট ১.০১হেক্টর জলায়তনে মাছের চাষ করে ৬লাখ ৬১ হাজার টাকা নীট লাভ করেছেন। তাঁর এই কর্মকান্ড অন্যান্যদের জন্য অনুকরণীয় ও উৎসাহব্যঞ্জক।

হারুন আরো বলেন, মাছ চাষ একটি নিবিড় প্রক্রিয়া। সব সময় সর্তক থাকতে হয়। পুকুরের পানি পরীক্ষা করতে হয়। একটি পুকুরে বানিজ্যিক ভাবে মাছ চাষ শুরু করি। প্রথম বছরেই লাভের মুখ দেখি। সেই শুরু এখন সাতটি পুকুরে মাছ চাষ করছি। মানুষ স্বপ্ন দেখতো আকাশ ছোঁয়ার। আকাশ ছোঁয়ার পর সেই ক্ষুদ্র মানুষগুলো এখন মহাকাশে বসবাস করার পরিকল্পনা করছে। দেখছে রঙ্গিন স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়? স্বপ্ন কি মাত্র একজন দেখে ? কোটি কোটি মানুষ স্বপ্ন দেখে। আমার স্বপ্নটা আলাদা। আমি মাছের মধ্যে স্বপ্ন আঁকি, স্বপ্ন বুনি, স্বপ্ন দেখি। প্রশ্ন হতে পারে মাছ চাষে কোন স্বপ্ন থাকে নাকি ? হ্যাঁ থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শি পরিকল্পনায় ২০১৫ সালে ভারতের সাথে ছিটমহল বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। আমার কুলাঘাট ইউনিয়নের বাঁশপচাই ভিতরকুটি গ্রামটি ছিটমহল নামক সীমান্ত জঠিলতামুক্ত হয়। তাই বাংলাদেশের নির্মল বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে এই দেশটাকে ভালোবাসলে বন্ধ চোখে ও চিক্ চিক্ করে জ্বলে স্বপ্ন। আমার একটাই স্বপ্ন“ লালমনির হাটের এই সাবেক ছিট মহলকে মাছে মাছে সমৃদ্ধ করে তোলা। তাই উচ্চ শিক্ষত হয়েও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে শ্রমিকের পাশাপাশি নিজেই শ্রম দিচ্ছি।

সরেজমিনে একদিন হারুনের মাছ চাষ প্রকল্প দেখতে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিকরা পুকুরের মাছকে খাবার দিচ্ছে। অন্য একটি পুকুরে মাছ ধরার জন্য জাল নামানো হয়েছে। হারুন লুঙ্গি কাছনি করে নেমে পড়েছেন পুকুরে। শ্রমিকদের সাথে জাল টানছেন। প্রায় দুই কেজি ওজনের একটি রুই মাছ বুকে নিয়ে আমাদের দেখিয়ে বলছেন, এই আমার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন লজ্জ্বাহীন। মুখে তাঁর তৃপ্তির হাসি। একটি ফোন এলো। হারুন পুকুর থেকে উঠে এসে রিসিভ করলেন। চোখ লাল হয়ে উঠলো তার। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো কার ফোন? তিনি বললেন, পুকুরের আয়তন বাড়াতে গিয়ে কিছু টাকা ধার করতে হয়েছে। টাকা চেয়ে ফোন করেছে একজন। ওই টাকা না নিয়ে কোন উপায় ছিল না। এ বছর মাছ বিক্রি হলে শোধ করে দেবো। করোনা কালিন দেয়া সরকারী কোন প্রনোদনা পায়নি হারুন। সাবেক ছিটমহল তাই জমির মূল্য সেখানে কম তাই ব্যাংক ঋণ করতে পারছেন না। এ জন্য তাঁর মনে দুঃখ। সরকারী ঋণ পেলে প্রকল্প বৃদ্ধির ইচ্ছা আছে হারুনের।

লালমনিরহাট সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহমুদুন্নবী মিঠু জানান, রংপুর বিভাগ মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় হারুনের ছয়টি পুকুর খনন করে দেয়া হয়েছে। সেখানে প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণসহ নানা কর্মসূচী আমরা করেছি। হারুনের সদিচ্ছার ঘাটতি ছিল না। তাই সে এখন সফল মৎস্য চাষী। লালমনিরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম, প্রান্তিক চাষি হিসেবে ও অনগ্রসর এলাকায় মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে অবদান ক্যাটাগরিতে রংপুর বিভাগের মধ্যে একমাত্র হারুন জাতীয় মৎস্য পদক ২০২১ পেয়েছে। এটি আমাদের সবার জন্য আনন্দের। হারুন এখন লালমনিরহাটের বেকার যুবকদের মধ্যে সফল উদ্যোক্তার উপমা। মৎস্য অধিদপ্তর রংপুরের বিভাগীয় উপ-পরিচালক ড. মোঃ সাইনার আলম বলেন, আমি লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার ছিটমহল বাঁশপচাই ভিতরকুটি গ্রামে হারুনের মৎস্য প্রকল্প পরিদর্শণে গিয়েছিলাম। তখনি মনে হয়েছিল হারুন পারবে। সত্যিই পেরেছে হারুন। হারুনের সফলতা দেখে শিক্ষিত যুব সমাজ মৎস্য চাষে এগিয়ে আসবে। মাছ চাষ করে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে এটিই প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি
Design & Developed BY SheraWeb.Com